
ভূরুঙ্গামারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি:
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আখতারুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি বরাদ্দের অর্থ বিতরণে অনিয়ম, টাকা আত্মসাৎ এবং উৎকোচ দাবির অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগে উপজেলার কয়েকজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কুড়িগ্রাম-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্যের কাছে লিখিত আবেদন করেছেন।
অভিযোগে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে স্কুল লেভেল ইমপ্রুভমেন্ট প্ল্যান (এসএলআইপি) প্রকল্পের আওতায় উপজেলার ১১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ১৫ থেকে ২২ হাজার টাকা পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়। ভ্যাট কর্তনের পর প্রতিটি বিদ্যালয়ের হিসাবে ১২ থেকে ১৯ হাজার টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও অধিকাংশ বিদ্যালয় নির্ধারিত অর্থ পায়নি।
অভিযোগকারীদের দাবি, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা প্রকল্পের অর্থ উত্তোলন করে নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখেন এবং বিদ্যালয়প্রতি এক হাজার ৪০০ টাকা উৎকোচ নেওয়ার বিনিময়ে মাত্র ২৮ থেকে ৩০টি বিদ্যালয়ে অর্থ ছাড় করেন। বাকি বিদ্যালয়গুলো উৎকোচ না দেওয়ায় তাদের বরাদ্দ আটকে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
একই অভিযোগে বলা হয়, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়প্রতি ৭ হাজার ৬০০ টাকা বরাদ্দ থাকলেও ৫০০ টাকা করে উৎকোচ নেওয়ার পর চেক বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া প্রায় ৩০টি বিদ্যালয় এখনো ওই বরাদ্দের অর্থ পায়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ক্ষুদ্র মেরামত খাতে উপজেলার আটটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ দেওয়া দেড় লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোতে না দিয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রেও বিদ্যালয়প্রতি ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা উৎকোচ দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত ভোটহাট ও দক্ষিণ চর-ভূরুঙ্গামারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেরামতের জন্য এক লাখ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলো সেই অর্থ পায়নি বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
নৈশপ্রহরীদের বেতন নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, উপজেলার ৩৯ জন নৈশপ্রহরীর বেতন বাবদ দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও উৎকোচের বিনিময়ে মাত্র দুই থেকে তিনজনকে বেতন দেওয়া হয়েছে এবং অন্যদের অর্থ ফেরত পাঠানো হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন প্রধান শিক্ষক জানান, তারা প্রয়োজনীয় ব্যয় সম্পন্ন করে ভাউচার জমা দিয়েছেন। পরে সংশোধনের জন্য বলা হলে সেটিও করা হয়। এরপরও দীর্ঘদিন ধরে তাদের বিদ্যালয়ের হিসাবে বরাদ্দের অর্থ জমা হয়নি। তাদের দাবি, যারা উৎকোচ দিয়েছেন, তারাই অর্থ পেয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আখতারুল ইসলামের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি প্রথমে ফোন রিসিভ করলেও সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা নিয়মিত ভূরুঙ্গামারীতে অবস্থান না করে রংপুর থেকে দায়িত্ব পালন করেন। সপ্তাহে মাত্র তিন দিন অফিস করায় বিভিন্ন কাজে আসা শিক্ষক ও সেবাপ্রার্থীদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায় চৌধুরী বলেন, “আমি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে দ্রুত অফিসে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছি। একই সঙ্গে এসএলআইপি প্রকল্পের অর্থ এবং ভোটকেন্দ্র মেরামতের বরাদ্দ দ্রুত সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের হিসাবে জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
কুড়িগ্রাম-১ আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, “আমি হোয়াটসঅ্যাপে এ-সংক্রান্ত একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সরকারি বরাদ্দ দ্রুত সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়গুলোর হিসাবে হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা।
Reporter Name 




















