Dhaka ০২:৫৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
বর্ষা মৌসুমে জমে উঠেছে কাউখালীর চাই-দুয়ারি হাট, ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা সাতক্ষীরায় নিম্ন আয়ের মানুষের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সুরক্ষায় ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প সাতক্ষীরা হবিগঞ্জে হামলার প্রতিবাদে সাতক্ষীরায় এনসিপির প্রতিবাদ সভা সাংবাদিক সুরক্ষা আইন প্রণয়নে আর বিলম্ব নয়, সরকারের প্রতি আহ্বান কাউখালীতে সাড়ে তিন হাজার মিটার অবৈধ চায়না দুয়ারী জাল জব্দ কাউখালীতে একই এলাকায় পরপর তিন চুরি, আতঙ্কে এলাকাবাসী সাপাহারে বিষ প্রয়োগে মাছ নিধনের অভিযোগ, ক্ষতি দেড় লাখের বেশি ফেসবুকের প্রেমে বাল্যবিয়ে, ৭ মাসের সন্তান ফিরে পেল ১৩ বছরের কিশোরী মা ডাকাতি-চুরি প্রতিরোধে নেছারাবাদে রাতের পাহারা, পুলিশ-জনতার যৌথ উদ্যোগ উপকূলের পরিবেশ পুনরুদ্ধারে শ্যামনগরে ১০ লাখ বীজ রোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন

বর্ষা মৌসুমে জমে উঠেছে কাউখালীর চাই-দুয়ারি হাট, ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৬:৫০:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
  • ৪ Time View

 

কাউখালী (পিরোজপুর) প্রতিনিধি

 

বর্ষার নতুন পানিতে খাল-বিল ও নদ-নদীতে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের আনাগোনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মাছ ধরার ঐতিহ্যবাহী উপকরণ চাই ও দুয়ারীর চাহিদা। মৌসুমকে কেন্দ্র করে পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার দক্ষিণ বাজারে সপ্তাহে দুই দিন বসছে চাই-দুয়ারীর জমজমাট হাট। প্রতি শুক্রবার ও সোমবার হাটের দিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ছাড়াও ভান্ডারিয়া, নেছারাবাদ ও নাজিরপুরসহ আশপাশের এলাকা থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা এসে খুচরা ও পাইকারি দরে এসব উপকরণ কেনাবেচা করছেন।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কাউখালীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চাই ও দুয়ারী তৈরির কুটির শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। বর্ষা মৌসুমের প্রায় ছয় মাস এ শিল্পকে ঘিরেই তাদের জীবিকা চলে। বিভিন্ন জাতের বাঁশ কেটে তৈরি হয় মাছ ধরার এই ঐতিহ্যবাহী সরঞ্জাম। একটি বাঁশ থেকে সাধারণত সাত থেকে আটটি চাই তৈরি করা গেলেও একজন দক্ষ কারিগর দিনে পাঁচ থেকে ছয়টির বেশি তৈরি করতে পারেন না।

 

বর্তমানে প্রকারভেদে এক কুড়ি (২০টি) চাই বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকায়। খুচরা বাজারে প্রতিটি চাইয়ের দাম ১৬০ থেকে ২০০ টাকা। কারিগরদের ভাষ্য, একটি বাঁশ কিনতেই এখন ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এসব চাই ও দুয়ারীতে ছোট দেশীয় মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়িও ধরা পড়ে।

 

চাই তৈরির কারিগর আব্দুল জলিল বলেন, “পরিবারের সবাই মিলে বর্ষার ছয় মাস এই কাজ করি। কিন্তু বাঁশের দাম, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভ খুবই কমে গেছে। একসময় চাইয়ের অনেক চাহিদা ছিল। এখন খাল-বিল ও নদ-নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছও কমে গেছে, ফলে বাজারও আগের মতো নেই। সরকার সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করলে এই কুটির শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।”

 

কাউখালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, “মে থেকে জুলাই পর্যন্ত অধিকাংশ দেশীয় মাছের প্রজনন মৌসুম। এ সময়ে মা মাছ সংরক্ষণে জেলেদের নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং সরকারিভাবে বিভিন্ন প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নিষিদ্ধ জাল ও অবৈধ উপায়ে মাছ শিকারের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। কারণ অবৈধ জালের নির্বিচার ব্যবহারে দেশীয় মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে।”

 

কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “চাইয়ের ব্যবহার অবশ্যই প্রচলিত আইন ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির মধ্যে হতে হবে। এমন কোনো উপকরণ ব্যবহার করা যাবে না, যাতে নির্বিচারে ছোট মাছ ধরা পড়ে। প্রজনন মৌসুমে মা মাছ ও পোনা সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।” তিনি আরও জানান, নিষিদ্ধ জাল ও অবৈধ উপায়ে মাছ শিকার বন্ধে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

 

বর্ষা মৌসুমকে ঘিরে কাউখালীর চাই-দুয়ারি হাট শুধু স্থানীয় অর্থনীতিকেই সচল করছে না, বরং গ্রামীণ কুটির শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যও ধরে রেখেছে। তবে এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে কারিগরদের জন্য সহজ ঋণ, কাঁচামালের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং দেশীয় জলাশয় সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Spread the love
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

বর্ষা মৌসুমে জমে উঠেছে কাউখালীর চাই-দুয়ারি হাট, ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা

বর্ষা মৌসুমে জমে উঠেছে কাউখালীর চাই-দুয়ারি হাট, ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা

Update Time : ০৬:৫০:২১ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

 

কাউখালী (পিরোজপুর) প্রতিনিধি

 

বর্ষার নতুন পানিতে খাল-বিল ও নদ-নদীতে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের আনাগোনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে মাছ ধরার ঐতিহ্যবাহী উপকরণ চাই ও দুয়ারীর চাহিদা। মৌসুমকে কেন্দ্র করে পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার দক্ষিণ বাজারে সপ্তাহে দুই দিন বসছে চাই-দুয়ারীর জমজমাট হাট। প্রতি শুক্রবার ও সোমবার হাটের দিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ছাড়াও ভান্ডারিয়া, নেছারাবাদ ও নাজিরপুরসহ আশপাশের এলাকা থেকে ক্রেতা-বিক্রেতারা এসে খুচরা ও পাইকারি দরে এসব উপকরণ কেনাবেচা করছেন।

 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কাউখালীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চাই ও দুয়ারী তৈরির কুটির শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। বর্ষা মৌসুমের প্রায় ছয় মাস এ শিল্পকে ঘিরেই তাদের জীবিকা চলে। বিভিন্ন জাতের বাঁশ কেটে তৈরি হয় মাছ ধরার এই ঐতিহ্যবাহী সরঞ্জাম। একটি বাঁশ থেকে সাধারণত সাত থেকে আটটি চাই তৈরি করা গেলেও একজন দক্ষ কারিগর দিনে পাঁচ থেকে ছয়টির বেশি তৈরি করতে পারেন না।

 

বর্তমানে প্রকারভেদে এক কুড়ি (২০টি) চাই বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকায়। খুচরা বাজারে প্রতিটি চাইয়ের দাম ১৬০ থেকে ২০০ টাকা। কারিগরদের ভাষ্য, একটি বাঁশ কিনতেই এখন ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা ব্যয় হচ্ছে। এসব চাই ও দুয়ারীতে ছোট দেশীয় মাছের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির চিংড়িও ধরা পড়ে।

 

চাই তৈরির কারিগর আব্দুল জলিল বলেন, “পরিবারের সবাই মিলে বর্ষার ছয় মাস এই কাজ করি। কিন্তু বাঁশের দাম, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভ খুবই কমে গেছে। একসময় চাইয়ের অনেক চাহিদা ছিল। এখন খাল-বিল ও নদ-নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছও কমে গেছে, ফলে বাজারও আগের মতো নেই। সরকার সহজ শর্তে স্বল্পসুদে ঋণের ব্যবস্থা করলে এই কুটির শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।”

 

কাউখালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, “মে থেকে জুলাই পর্যন্ত অধিকাংশ দেশীয় মাছের প্রজনন মৌসুম। এ সময়ে মা মাছ সংরক্ষণে জেলেদের নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং সরকারিভাবে বিভিন্ন প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় নিষিদ্ধ জাল ও অবৈধ উপায়ে মাছ শিকারের বিরুদ্ধে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। কারণ অবৈধ জালের নির্বিচার ব্যবহারে দেশীয় মাছের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে।”

 

কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “চাইয়ের ব্যবহার অবশ্যই প্রচলিত আইন ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির মধ্যে হতে হবে। এমন কোনো উপকরণ ব্যবহার করা যাবে না, যাতে নির্বিচারে ছোট মাছ ধরা পড়ে। প্রজনন মৌসুমে মা মাছ ও পোনা সংরক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।” তিনি আরও জানান, নিষিদ্ধ জাল ও অবৈধ উপায়ে মাছ শিকার বন্ধে উপজেলা প্রশাসনের অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।

 

বর্ষা মৌসুমকে ঘিরে কাউখালীর চাই-দুয়ারি হাট শুধু স্থানীয় অর্থনীতিকেই সচল করছে না, বরং গ্রামীণ কুটির শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যও ধরে রেখেছে। তবে এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে কারিগরদের জন্য সহজ ঋণ, কাঁচামালের মূল্য নিয়ন্ত্রণ এবং দেশীয় জলাশয় সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Spread the love