Dhaka ০১:৫২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬, ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
উপকূলের পরিবেশ পুনরুদ্ধারে শ্যামনগরে ১০ লাখ বীজ রোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন ডি.বি. ইউনাইটেড হাইস্কুলে ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ, এমপি মুহাদ্দিস আব্দুল খালেককে সংবর্ধনা শ্যামনগরে চৌকিদার প্যারেড পরিদর্শনে পুলিশ সুপার, অপরাধ দমনে তৎপরতার নির্দেশ সাতক্ষীরায় বিজিবির মাদকদ্রব্য ধ্বংসকরণ অনুষ্ঠান, উপস্থিত ছিলেন পুলিশ সুপার আর্থ জার্নালিজম নেটওয়ার্কের ফেলোশিপ পাওয়ায় আহসান রাজীবকে সাংবাদিক কেন্দ্রের অভিনন্দন কাউখালীতে নজরুল বর্ষ উপলক্ষে উপজেলা পর্যায়ের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা শুরু কাউখালীতে জমিজমা নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ৮ সাতক্ষীরায় জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক বিশেষ সভা সাতক্ষীরায় সাংবাদিকদের সঙ্গে নবাগত খুলনা রেঞ্জ ডিআইজির মতবিনিময় সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে রোগী কল্যাণ সমিতির বার্ষিক সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত

সাতক্ষীরায় লবণাক্ত জমিতে খেজুর চাষ, ভাঙন ঠেকাতে দেখাচ্ছে সম্ভাবনা

  • Reporter Name
  • Update Time : ০৫:১৬:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬
  • ২৩৯ Time View

 

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ;

ঝড় এলেই বাঁধ ভাঙে–এটা যেন উপকূলের মানুষের কাছে এখন চেনা বাস্তবতা। জলোচ্ছ্বাসে লোনা পানি ঢুকে পড়ে মাঠে, নষ্ট হয় ফসল, ক্ষতিগ্রস্ত হয় বসতভিটা। সেই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার আগেই আবার নতুন কোনো দুর্যোগের আশঙ্কা। এমন এক বাস্তবতায় সাতক্ষীরার শ্যামনগরে খেজুরগাছকে ঘিরে ভাঙন ঠেকানোর এক ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।

উপজেলার হওয়ালভাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা জি এম সিরাজুল ইসলাম নিজ উদ্যোগে খেজুরবাগান গড়ে তুলেছেন। শ্যামনগর-নওয়াবেঁকি সড়কের পাশে আট বিঘা জমিতে তিনি মাছ চাষের পাশাপাশি সৌদি আরবের আজওয়া, মরিয়ম ও মেডজুল জাতের খেজুর চাষ করছেন।

সিরাজুলের বাগানে ঢুকলেই চোখে পড়ে সারিবদ্ধ খেজুরগাছ, ডালে ঝুলছে থোকা থোকা ফল। কিছু গাছে ফল এসেছে, তবে খেজুরের প্রকৃত গুরুত্ব শুধু দৃশ্যমান ফলনে নয়। মাটির নিচে বিস্তৃত শিকড় উপকূলীয় পাড়ের মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখছে, যা ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় মাটির ক্ষয় ও ভাঙন রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

চার বছর আগে সিরাজুল ইসলাম লবণাক্ত জমিতে খেজুর চাষ শুরু করেন। আশপাশের জমিতে তখন ধান বা সবজি চাষে কৃষকরা লোকসান গুনছিলেন। অনেকেই বিদেশি খেজুর লাগানোকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করতেন। প্রথম দুই বছরে ফল এসেছে, তবে তিনি তা কাটিয়ে গাছের বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। ধীরে ধীরে গাছ বড় হয়ে ফলন দিতে শুরু করেছে।

বাগানের ভেতরে ছোট ছোট ঘের তৈরি করা হয়েছে। এতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা হয়, মাটির আর্দ্রতা থাকে এবং লবণাক্ততা কিছুটা কমে। ঘেরগুলোতে মাছ চাষও হচ্ছে। অর্থাৎ একই জমিতে একাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। খেজুরের চারা মূলত বীজ থেকে তৈরি হয়। প্রতিটি বীজ দুই দিন পানি ভিজিয়ে রেখে আধা ইঞ্চি গভীরে মাটিতে রোপণ করা হয়। চারা গজানোর তিন মাস পর ইউরিয়ামিশ্রিত পানি স্প্রে করা হয়। বাগানে গাছের দূরত্ব ১৫-২০ ফুট রাখা হয়। রোপণের জন্য ৩ ফুট গভীর গর্তে ৮-১০ কেজি গোবর ও হাড়ের গুঁড়া মিশিয়ে নেওয়া হয়।

সৌদি খেজুরের পরাগায়ন পদ্ধতি বেশ কারিগরি। স্ত্রী গাছের ফুল ফুটলে পুরুষ গাছের পরাগরেণু সেখানে লাগিয়ে রশি দিয়ে বেঁধে দিতে হয়। পরাগরেণু ফ্রিজে ২-৩ বছর সংরক্ষণযোগ্য। সিরাজুল ইসলামের নার্সারি থেকে স্থানীয় কৃষকরা চারা সংগ্রহ করে নিজ নিজ জমিতে লাগাচ্ছেন। বর্তমানে নার্সারিতে ৩০০টি চারা আছে।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘উপকূলে লবণাক্ততার কারণে ধান বা সবজি চাষে ক্ষতি হয়, তাই আমি এই ৮ বিঘা জমিতে সৌদি জাতের খেজুর চাষ শুরু করি। প্রথম দুই বছর ফল এলেও গাছ বড় করার জন্য তা কেটে দিয়েছিলাম। এখন প্রত্যেকটি গাছ থেকে ৮০ থেকে ১০০ কেজি খেজুর আশা করছি। এ ছাড়া বাগানের মাঝখানে ঘের করে পানি ধরে রাখা এবং মাছ চাষের মাধ্যমে একই জমিতে একাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করেছি। আশা করি, স্থানীয় কৃষকরাও এই চারা ব্যবহার করে নিজের জমি ও জীবিকা শক্তিশালী করতে পারবেন।’

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খেজুরগাছের শিকড়। কৃষিবিদদের মতে, শিকড় গভীর ও বিস্তৃত। মাটির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে থাকা শিকড় মাটিকে একসঙ্গে ধরে রাখে। ফলে বাঁধ বা পাড়ের মাটি সহজে আলগা হয় না। তীব্র বাতাসের সময় গাছের সারি বাতাসের গতি কমায়, মাটির ক্ষয় কমে। গাছের ছায়া ও ঝরা পাতা মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে, যা ভাঙন রোধে গুরুত্বপূর্ণ; যা স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়াচ্ছে। বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের আফজাল হোসেন বলেন, ‘আগে লবণাক্ততার কারণে জমিতে ফসল ঠিকমতো হতো না। এখন খেজুরগাছ দেখে অনেকে ঘেরের পাড়ে চারা লাগাচ্ছেন। এতে আয় বাড়বে এবং মাটিও কিছুটা সুরক্ষিত থাকবে।’

কৃষি গবেষকদের মতে, ২০১৩-১৪ সালের দিকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্যোগে দেশে সৌদি খেজুরের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। চারা তৈরির জন্য বালু, ছাই ও গোবরমিশ্রিত মাটিতে ‘রুটোন’ মিশিয়ে নিতে হয়। বীজ দুই দিন পানি ভিজিয়ে রেখে আধা ইঞ্চি নিচে রোপণ করতে হয়। চারা গজানোর তিন মাস পর ইউরিয়ামিশ্রিত পানি স্প্রে করতে হয়। বাগানে গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১৫-২০ ফুট রাখতে হয়। রোপণের জন্য ৩ ফুট গভীর গর্তে ৮-১০ কেজি গোবর ও হাড়ের গুঁড়া মিশিয়ে নেওয়া হয়।

দেশীয় খেজুরগাছের গুরুত্বও কম নয়। এর শিকড় মাটির গভীরে বিস্তৃত হয়ে মাটিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে রাখে। ফলে জলোচ্ছ্বাস বা ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাঁধের মাটি ধসে যাওয়া কমে। লোনা বাতাস ও তীব্র দাবদাহ সহ্য করার ক্ষমতা থাকায় এই গাছ দীর্ঘকাল টিকে থাকে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বেড়ে গেছে, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। কংক্রিট বাঁধের পাশাপাশি গাছভিত্তিক প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থা জরুরি হয়ে উঠেছে। খেজুর গাছ সেই বিকল্প হিসেবে সামনে আসছে। এটি লবণাক্ত পরিবেশে টিকে থাকে, মাটির গঠন শক্ত করে এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। পাতা দিয়ে গ্রামাঞ্চলে এখনো শীতল পাটি তৈরি হয়, ফল, রস ও গুড়ও পাওয়া যায়।

সাতক্ষীরা হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক আমজাদ হোসেন বলেছেন, উপকূলীয় এলাকায় অতিরিক্ত জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় বা লোনা বাতাসের কারণে মাটি আলগা হয়ে গেলে ক্ষতি অনেক বাড়ে। এ অবস্থায় কংক্রিট বা পাথরের বাঁধই একমাত্র সমাধান নয়। প্রাকৃতিক সমাধান হিসেবে খেজুরগাছ রোপণ অত্যন্ত কার্যকর। পরিকল্পনা অনুযায়ী খেজুরগাছ লাগালে এর শিকড় মাটির গভীর ও বিস্তৃত স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। এটি মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখে, যা বাঁধের স্থায়িত্ব এবং ভাঙন রোধে সহায়ক।

তিনি আরও যোগ করেন, খেজুরগাছ শুধু মাটিকে ধরে রাখে না; এর সারি বাতাসের গতিকে কমিয়ে দেয়, মাটির ক্ষয় প্রতিরোধ করে এবং ছায়া ও ঝরা পাতা মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে যদি খেজুরগাছ লাগানো হয়, তবে তা টেকসই বাঁধ হিসেবে কাজ করবে এবং মাটির ক্ষয় ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি অনেকাংশে কমাবে।

Spread the love
Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

উপকূলের পরিবেশ পুনরুদ্ধারে শ্যামনগরে ১০ লাখ বীজ রোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন

সাতক্ষীরায় লবণাক্ত জমিতে খেজুর চাষ, ভাঙন ঠেকাতে দেখাচ্ছে সম্ভাবনা

Update Time : ০৫:১৬:৪১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ এপ্রিল ২০২৬

 

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি ;

ঝড় এলেই বাঁধ ভাঙে–এটা যেন উপকূলের মানুষের কাছে এখন চেনা বাস্তবতা। জলোচ্ছ্বাসে লোনা পানি ঢুকে পড়ে মাঠে, নষ্ট হয় ফসল, ক্ষতিগ্রস্ত হয় বসতভিটা। সেই ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার আগেই আবার নতুন কোনো দুর্যোগের আশঙ্কা। এমন এক বাস্তবতায় সাতক্ষীরার শ্যামনগরে খেজুরগাছকে ঘিরে ভাঙন ঠেকানোর এক ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে।

উপজেলার হওয়ালভাঙ্গী গ্রামের বাসিন্দা জি এম সিরাজুল ইসলাম নিজ উদ্যোগে খেজুরবাগান গড়ে তুলেছেন। শ্যামনগর-নওয়াবেঁকি সড়কের পাশে আট বিঘা জমিতে তিনি মাছ চাষের পাশাপাশি সৌদি আরবের আজওয়া, মরিয়ম ও মেডজুল জাতের খেজুর চাষ করছেন।

সিরাজুলের বাগানে ঢুকলেই চোখে পড়ে সারিবদ্ধ খেজুরগাছ, ডালে ঝুলছে থোকা থোকা ফল। কিছু গাছে ফল এসেছে, তবে খেজুরের প্রকৃত গুরুত্ব শুধু দৃশ্যমান ফলনে নয়। মাটির নিচে বিস্তৃত শিকড় উপকূলীয় পাড়ের মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখছে, যা ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় মাটির ক্ষয় ও ভাঙন রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

চার বছর আগে সিরাজুল ইসলাম লবণাক্ত জমিতে খেজুর চাষ শুরু করেন। আশপাশের জমিতে তখন ধান বা সবজি চাষে কৃষকরা লোকসান গুনছিলেন। অনেকেই বিদেশি খেজুর লাগানোকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করতেন। প্রথম দুই বছরে ফল এসেছে, তবে তিনি তা কাটিয়ে গাছের বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিয়েছেন। ধীরে ধীরে গাছ বড় হয়ে ফলন দিতে শুরু করেছে।

বাগানের ভেতরে ছোট ছোট ঘের তৈরি করা হয়েছে। এতে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা হয়, মাটির আর্দ্রতা থাকে এবং লবণাক্ততা কিছুটা কমে। ঘেরগুলোতে মাছ চাষও হচ্ছে। অর্থাৎ একই জমিতে একাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। খেজুরের চারা মূলত বীজ থেকে তৈরি হয়। প্রতিটি বীজ দুই দিন পানি ভিজিয়ে রেখে আধা ইঞ্চি গভীরে মাটিতে রোপণ করা হয়। চারা গজানোর তিন মাস পর ইউরিয়ামিশ্রিত পানি স্প্রে করা হয়। বাগানে গাছের দূরত্ব ১৫-২০ ফুট রাখা হয়। রোপণের জন্য ৩ ফুট গভীর গর্তে ৮-১০ কেজি গোবর ও হাড়ের গুঁড়া মিশিয়ে নেওয়া হয়।

সৌদি খেজুরের পরাগায়ন পদ্ধতি বেশ কারিগরি। স্ত্রী গাছের ফুল ফুটলে পুরুষ গাছের পরাগরেণু সেখানে লাগিয়ে রশি দিয়ে বেঁধে দিতে হয়। পরাগরেণু ফ্রিজে ২-৩ বছর সংরক্ষণযোগ্য। সিরাজুল ইসলামের নার্সারি থেকে স্থানীয় কৃষকরা চারা সংগ্রহ করে নিজ নিজ জমিতে লাগাচ্ছেন। বর্তমানে নার্সারিতে ৩০০টি চারা আছে।

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘উপকূলে লবণাক্ততার কারণে ধান বা সবজি চাষে ক্ষতি হয়, তাই আমি এই ৮ বিঘা জমিতে সৌদি জাতের খেজুর চাষ শুরু করি। প্রথম দুই বছর ফল এলেও গাছ বড় করার জন্য তা কেটে দিয়েছিলাম। এখন প্রত্যেকটি গাছ থেকে ৮০ থেকে ১০০ কেজি খেজুর আশা করছি। এ ছাড়া বাগানের মাঝখানে ঘের করে পানি ধরে রাখা এবং মাছ চাষের মাধ্যমে একই জমিতে একাধিক ব্যবহার নিশ্চিত করেছি। আশা করি, স্থানীয় কৃষকরাও এই চারা ব্যবহার করে নিজের জমি ও জীবিকা শক্তিশালী করতে পারবেন।’

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খেজুরগাছের শিকড়। কৃষিবিদদের মতে, শিকড় গভীর ও বিস্তৃত। মাটির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে থাকা শিকড় মাটিকে একসঙ্গে ধরে রাখে। ফলে বাঁধ বা পাড়ের মাটি সহজে আলগা হয় না। তীব্র বাতাসের সময় গাছের সারি বাতাসের গতি কমায়, মাটির ক্ষয় কমে। গাছের ছায়া ও ঝরা পাতা মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে, যা ভাঙন রোধে গুরুত্বপূর্ণ; যা স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়াচ্ছে। বুড়িগোয়ালিনী গ্রামের আফজাল হোসেন বলেন, ‘আগে লবণাক্ততার কারণে জমিতে ফসল ঠিকমতো হতো না। এখন খেজুরগাছ দেখে অনেকে ঘেরের পাড়ে চারা লাগাচ্ছেন। এতে আয় বাড়বে এবং মাটিও কিছুটা সুরক্ষিত থাকবে।’

কৃষি গবেষকদের মতে, ২০১৩-১৪ সালের দিকে প্রবাসী বাংলাদেশিদের উদ্যোগে দেশে সৌদি খেজুরের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। চারা তৈরির জন্য বালু, ছাই ও গোবরমিশ্রিত মাটিতে ‘রুটোন’ মিশিয়ে নিতে হয়। বীজ দুই দিন পানি ভিজিয়ে রেখে আধা ইঞ্চি নিচে রোপণ করতে হয়। চারা গজানোর তিন মাস পর ইউরিয়ামিশ্রিত পানি স্প্রে করতে হয়। বাগানে গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১৫-২০ ফুট রাখতে হয়। রোপণের জন্য ৩ ফুট গভীর গর্তে ৮-১০ কেজি গোবর ও হাড়ের গুঁড়া মিশিয়ে নেওয়া হয়।

দেশীয় খেজুরগাছের গুরুত্বও কম নয়। এর শিকড় মাটির গভীরে বিস্তৃত হয়ে মাটিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে রাখে। ফলে জলোচ্ছ্বাস বা ঘূর্ণিঝড়ের সময় বাঁধের মাটি ধসে যাওয়া কমে। লোনা বাতাস ও তীব্র দাবদাহ সহ্য করার ক্ষমতা থাকায় এই গাছ দীর্ঘকাল টিকে থাকে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বেড়ে গেছে, ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। কংক্রিট বাঁধের পাশাপাশি গাছভিত্তিক প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থা জরুরি হয়ে উঠেছে। খেজুর গাছ সেই বিকল্প হিসেবে সামনে আসছে। এটি লবণাক্ত পরিবেশে টিকে থাকে, মাটির গঠন শক্ত করে এবং অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক। পাতা দিয়ে গ্রামাঞ্চলে এখনো শীতল পাটি তৈরি হয়, ফল, রস ও গুড়ও পাওয়া যায়।

সাতক্ষীরা হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক আমজাদ হোসেন বলেছেন, উপকূলীয় এলাকায় অতিরিক্ত জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় বা লোনা বাতাসের কারণে মাটি আলগা হয়ে গেলে ক্ষতি অনেক বাড়ে। এ অবস্থায় কংক্রিট বা পাথরের বাঁধই একমাত্র সমাধান নয়। প্রাকৃতিক সমাধান হিসেবে খেজুরগাছ রোপণ অত্যন্ত কার্যকর। পরিকল্পনা অনুযায়ী খেজুরগাছ লাগালে এর শিকড় মাটির গভীর ও বিস্তৃত স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। এটি মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখে, যা বাঁধের স্থায়িত্ব এবং ভাঙন রোধে সহায়ক।

তিনি আরও যোগ করেন, খেজুরগাছ শুধু মাটিকে ধরে রাখে না; এর সারি বাতাসের গতিকে কমিয়ে দেয়, মাটির ক্ষয় প্রতিরোধ করে এবং ছায়া ও ঝরা পাতা মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে যদি খেজুরগাছ লাগানো হয়, তবে তা টেকসই বাঁধ হিসেবে কাজ করবে এবং মাটির ক্ষয় ও ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকি অনেকাংশে কমাবে।

Spread the love