
সাপাহার (নওগাঁ) প্রতিনিধি:
নামে ইন্টারনেট সংযোগ থাকলেও বাস্তবে তার কোনো কার্যকারিতা নেই। ফাইবার অপটিক্যাল ক্যাবলের মাধ্যমে সংযোগ দেওয়া হলেও ব্যবহার করা যাচ্ছে না সেই সেবা। ফলে নওগাঁর সাপাহার উপজেলার ৮৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় তিন মাস ধরে ব্যাহত হচ্ছে অনলাইন হাজিরা, দাপ্তরিক যোগাযোগ ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম। বাধ্য হয়ে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মোবাইল ডাটা ব্যবহার করতে হচ্ছে, আর কোনো কোনো বিদ্যালয় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে বিকল্প ইন্টারনেট সংযোগ নিয়েছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে উচ্চগতির ইন্টারনেট সুবিধা নিশ্চিত করতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের ‘ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন (ইডিসি)-১ম সংশোধিত’ প্রকল্পের আওতায় সাপাহারের বিদ্যালয়গুলোতে ফাইবার অপটিক্যাল সংযোগ স্থাপন করা হয়। শুরুতে কিছুদিন সেবা সচল থাকলেও পরে তা কার্যত অচল হয়ে পড়ে বলে অভিযোগ শিক্ষকদের।
শিক্ষকদের মতে, বর্তমানে বিদ্যালয়ের অধিকাংশ দাপ্তরিক কার্যক্রমই অনলাইননির্ভর। অনলাইন হাজিরা প্রদান, বিভিন্ন তথ্য ও প্রতিবেদন প্রেরণ, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা গ্রহণ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনায় নিয়মিত ইন্টারনেট প্রয়োজন হয়। কিন্তু সরকারি সংযোগ অকার্যকর থাকায় এসব কাজ সম্পন্ন করতে বাড়তি ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
সাপাহার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিরুল ইসলাম বলেন, “বর্তমান সময়ে বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনায় ইন্টারনেট অপরিহার্য। কিন্তু প্রায় তিন মাস ধরে সংযোগ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে স্থানীয়ভাবে নতুন ইন্টারনেট সংযোগ নিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে।”
উপজেলার দমদমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষক সমিতির সভাপতি জাকারিয়া আলম বলেন, “ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর অফিসিয়াল কাজ অনেক সহজ হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সংযোগ অচল থাকায় সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।”
একই অভিযোগ করেছেন রামাশ্রম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রশিদ, ওড়ুনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা।
শিক্ষক শামীম আহমেদ বলেন, “অনলাইন হাজিরা নিয়মিত পাঠাতে হয়। বিদ্যালয়ের সংযোগ অচল থাকায় ব্যক্তিগত মোবাইল ডাটা ব্যবহার করে সেই কাজ করতে হচ্ছে।”
শিক্ষকদের অভিযোগ, সমস্যাটি শুধু অনলাইন হাজিরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিদিন বিভিন্ন তথ্য আদান-প্রদান, প্রশাসনিক নির্দেশনা গ্রহণ ও শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট নানা কার্যক্রম পরিচালনায় ইন্টারনেটের প্রয়োজন হয়। সরকারি সংযোগ অচল থাকায় সময় ও অর্থ—দুই দিক থেকেই ক্ষতির মুখে পড়ছেন তারা। কোনো কোনো বিদ্যালয় নিজস্ব উদ্যোগে স্থানীয় ইন্টারনেট সংযোগ নিয়েছে, ফলে সরকারি সংযোগ থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
জানা গেছে, বিদ্যালয়গুলোতে উচ্চগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মধ্যে ২০২৫ সালের ১৪ আগস্ট একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। ওই সমঝোতা অনুযায়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে End User Connectivity-এর মাধ্যমে ২০ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। সংযোগের কার্যকারিতা ও সেবার মান নিশ্চিত করার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে সাপাহারের ৮৩টি বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংযোগ অচল থাকায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষকরা। তাদের ভাষ্য, সরকারি অর্থ ব্যয়ে অবকাঠামো ও সংযোগ স্থাপন করা হলেও সেটি সচল না থাকলে প্রকল্পের সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।
সাপাহার উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ওয়াহেদুল্লাহ প্রামাণিক বলেন, “প্রায় তিন মাস ধরে বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে ইন্টারনেট সমস্যার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। দ্রুত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বিষয়টি তুলে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আইটি ইঞ্জিনিয়ার শওকত হোসেন সুইট বলেন, “আমাদের সার্ভারে কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যা হয়েছে। সে কারণে কিছু স্থানে সেবা বিঘ্নিত হয়েছে। দ্রুত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। তবে তিন মাস ধরে পুরোপুরি সমস্যা রয়েছে—এ দাবি সঠিক নয়।”
শিক্ষকদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকা সরকারি ইন্টারনেট সংযোগ দ্রুত সচল করা হবে। এতে বিদ্যালয়ের অনলাইন ও দাপ্তরিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হবে এবং ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় করে ইন্টারনেট ব্যবহারের বাড়তি চাপ থেকেও মুক্তি মিলবে।
তাদের মতে, শুধু সংযোগ স্থাপন করলেই হবে না; সেবার ধারাবাহিকতা ও কার্যকারিতাও নিশ্চিত করতে হবে।
Reporter Name 



















