নেছারাবাদ (পিরোজপুর) প্রতিনিধি;
নৌকাবাইচকে ঘিরে দিনভর আয়োজন। সন্ধ্যার পর শুরু কনসার্ট, যা গড়ায় গভীর রাত পর্যন্ত। এরই মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন। পরে বিদ্যালয়ের সংরক্ষিত কক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ দুধ নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়ার পর বিদ্যালয়ে ফেরত দেওয়া হয় ২৭ প্যাকেট দুধ।

বিদ্যালয়ে আপ্যায়ন থেকে দুধ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ এবং পরে সেই দুধ ফেরত ঘটনা গুলোর মধ্যে যোগসূত্র কী? কারা ছিলেন আয়োজনে, বিদ্যালয়ে কারা উপস্থিত ছিলেন এবং দুধ ফেরত দেওয়ার অর্থই বা এল কোথা থেকে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে নানা তথ্য পাওয়া গেছে। তবে অভিযোগগুলোর পূর্ণ সত্যতা নির্ধারণে প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত।
পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার ১ নম্বর বলদিয়া ইউনিয়নের বিন্নায় নৌকাবাইচকে কেন্দ্র করে দিনব্যাপী আয়োজন করা হয়। স্থানীয় সূত্রের জানাযায়, আয়োজকদের সঙ্গে বিএনপি নেতা মো. ইমদাদুল হক ও সরকারি স্বরূপকাঠি কলেজ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. নাদিম মাহমুদসহ কয়েকজন যুক্ত ছিলেন। নৌকাবাইচের প্রথম পুরস্কার বিতরণ করেন বলদিয়া ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. মহিবুল্লাহ।

স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নৌকাবাইচের পাশাপাশি রাতে কনসার্টের আয়োজন করা হয়। সেই আয়োজনকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ বিন্না কাইলান্তরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অতিথি আপ্যায়নের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ বা স্থাপনা এ ধরনের অনুষ্ঠানে ব্যবহার কিংবা সেখানে অতিথি আপ্যায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছিল কি না এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
সংরক্ষিত কক্ষ থেকে দুধ নেওয়ার ভিডিও
ঘটনার মোড় ঘোরে বিদ্যালয়ের সংরক্ষিত কক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ দুধ নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর। ‘ভয়েস অব নেছারাবাদ’ পেজে ভিডিওটি প্রকাশের পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা জহুরা আক্তার আশা ঘটনাটি ভিডিও ধারণ করেন এবং পরে সেটি বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মীর কাছে পাঠান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক মন্তব্যে তিনি দাবি করেন, অনুষ্ঠানের সময় প্রধান শিক্ষক ছাড়া অন্য কোনো শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন না। তবে বিদ্যালয়ে সেদিন কারা ছিলেন, কখন ছিলেন এবং কী ঘটেছিল তা কতৃপক্ষের নিরপেক্ষ ভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।

২৭ প্যাকেট দুধ ফেরত, উঠছে নতুন প্রশ্ন।
ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে বিদ্যালয়ে ২৭ প্যাকেট দুধ ফেরত দেওয়া হয়। স্থানীয় দাবি, পার্শবর্তী উপজেলা বানারীপাড়ার সংশ্লিষ্ট ডিলারের কাছ থেকে দুধগুলো সংগ্রহ করা হয়। দুধ সংগ্রহ ও ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়ায় নাদিম মাহমুদ, মারিফুল ও তাজসহ কয়েকজন যুক্ত ছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হচ্ছে। পরে মো. মহিবুল্লাহ বিদ্যালয়ে যান বলেও কয়েকজন শিক্ষক জানিয়েছেন।
তবে এখানেই দেখা দিয়েছে অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের বরাদ্দ দুধ নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠার পর বাইরে থেকে একই পরিমাণ দুধ সংগ্রহ করে ফেরত দেওয়ার প্রয়োজন হলো কেন?
দুধের মূল্য কে পরিশোধ করেছেন? ডিলারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কে? দুধগুলো বিদ্যালয়ের বরাদ্দের অংশ ছিল, নাকি বাইরে থেকে কেনা হয়েছিল? এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।
তাহলে দেখা গেছে এই ঘটনার সাথে নাদিম একা জড়িত নয় কিন্তু সাংগঠনিক ভাবে নাদিমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
তবে এতে পুরো ঘটনার দায়-দায়িত্বের বিষয়টি বাকিরাও এড়াতে পারে কিনা? তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
কারণ, বিষয়টি শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে সীমাবদ্ধ নয়। একই ঘটনার ধারাবাহিকতায় রয়েছে নৌকাবাইচ, রাতের কনসার্ট, সরকারি বিদ্যালয়ে অতিথি আপ্যায়নের অভিযোগ, বহিরাগতদের উপস্থিতি, শিক্ষার্থীদের বরাদ্দ দুধ নিয়ে যাওয়ার ভিডিও এবং পরে ২৭ প্যাকেট দুধ ফেরত দেওয়ার ঘটনা।
ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র বের করতে হলে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন বা অতিথি আপ্যায়নের অনুমতি ছিল কি না? সেদিন বিদ্যালয়ে কারা উপস্থিত ছিলেন? সংরক্ষিত কক্ষ থেকে দুধ কে বা কারা নিয়ে গিয়েছিলেন? ভিডিওটি কে ধারণ করেছিলেন এবং ঘটনার সময় কী ঘটেছিল?পরে ২৭ প্যাকেট দুধ কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়?।দুধের মূল্য কে পরিশোধ করেছেন?বিদ্যালয়ে দুধ ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছিলেন?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিললেই বোঝা যাবে, ঘটনাটি নিছক অব্যবস্থাপনা, নাকি এর পেছনে আরও কোনো বিষয় রয়েছে। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে নৌকাবাইচ ও কনসার্টের আয়োজক, বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী, ভিডিও ধারণকারী ব্যক্তি, দুধ সরবরাহকারী ডিলার এবং দুধ ফেরত দেওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। পাশাপাশি বিদ্যালয়ের উপস্থিতি-সংক্রান্ত তথ্য, দুধ সরবরাহের হিসাব এবং ফেরত দেওয়া ২৭ প্যাকেট দুধের উৎস যাচাই করা হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে কার কী ভূমিকা ছিল, কি উদ্দেশ্যে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হলো, পরিকল্পিতভাবে নাদিমকে ফাঁসিয়ে দেয়ার জন্য নাকি এর পেছনে আরো কোন উদ্দেশ্য ছিল? তা নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
Reporter Name 


















