সাপাহার (নওগাঁ) প্রতিনিধি:
স্বামী থাকলেও সংসারে নেই কোনো উপার্জনক্ষম মানুষ। দুই মেয়ের বিয়ে হয়েছে আগেই। এর মধ্যে এক মেয়ে স্বামীর সংসার ছেড়ে দুই সন্তানকে নিয়ে ফিরে এসেছেন মায়ের ঘরে। ফলে নিজের সঙ্গে মেয়ে ও দুই নাতি-নাতনিকে নিয়ে চার সদস্যের পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী এখন ৫০ বছর বয়সী লাইলী বেগম।
নওগাঁর সাপাহার উপজেলার গাঞ্জাকুড়ি গ্রামের বাসিন্দা লাইলী বেগম বাড়ির উঠানের সামান্য জায়গায় শাক-সবজি চাষ করেন। সেই সবজি স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে যে অল্প আয় হয়, তা দিয়েই চলে পরিবারের খাবার, চিকিৎসা ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ। কোনো দিন বিক্রি ভালো হয়, কোনো দিন অবিক্রীত অবস্থায় বাড়ি ফিরতে হয়। তবুও থেমে থাকার সুযোগ নেই তাঁর। কারণ এই সামান্য আয়ই পরিবারের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সাপাহার উপজেলা সদরের কাঁচাবাজারে অল্প কিছু কচুর মোচা নিয়ে বসেছিলেন লাইলী। বাজারে তাঁর কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নেই। কখনো ফুটপাতে, কখনো দোকানের সামনে, আবার কখনো মানুষের চলাচলের পথের পাশে বসেই বিক্রি করতে হয় উৎপাদিত সবজি।
বাজারের ব্যস্ততার মাঝেও সামান্য সবজি সামনে সাজিয়ে নীরবে অপেক্ষা করছিলেন তিনি। কেউ দাম জিজ্ঞেস করছেন, কেউ কিনছেন, আবার কেউ না কিনেই চলে যাচ্ছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও সবজি বিক্রি না হলে হতাশা নিয়েই বাড়ি ফিরতে হয় তাঁকে।
লাইলী বেগম বলেন, “আমার সংসারে আয় করার মতো কেউ নেই। বাড়ির উঠানে অল্প জায়গায় শাক-সবজি চাষ করি। সেগুলো বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাই। কিন্তু বাজারে এসেও বসার নির্দিষ্ট জায়গা পাই না। এভাবে আর কতদিন চলতে পারব জানি না।”
কথাগুলো বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি।
অভাবের সংসারের পাশাপাশি বন বিভাগের সঙ্গে চলমান একাধিক মামলার খরচও বহন করতে হচ্ছে লাইলীকে। সংসারের ব্যয় ও মামলার খরচ মেটাতে প্রতিদিনই তাঁকে নতুন করে সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “সরকারি বা কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সহযোগিতা পাইনি। যদি আমাকে একটা ফ্যামিলি কার্ডের ব্যবস্থা করে দেওয়া হতো, তাহলে সংসারটা একটু ভালোভাবে চালাতে পারতাম।”
স্থানীয়দের মতে, এককালীন আর্থিক সহায়তা লাইলীর সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। তাঁর সবজি চাষের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে চাষাবাদ সম্প্রসারণ, ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি কিংবা নারীদের স্বাবলম্বী করার কোনো প্রকল্পের আওতায় আনা গেলে তিনি নিজেই পরিবারের দায়িত্ব আরও ভালোভাবে পালন করতে পারবেন।
তাঁদের দাবি, সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় লাইলী বেগমকে ফ্যামিলি কার্ডের সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে স্থায়ীভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
বড় কোনো পুঁজি নেই, নেই দোকান কিংবা পর্যাপ্ত জমিজমা। সম্বল বলতে বাড়ির উঠানের একচিলতে মাটি আর নিজের দুই হাতের পরিশ্রম। সেই মাটিতেই সবজি ফলিয়ে পরিবারের মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছেন লাইলী বেগম।
তাঁর চাওয়াও খুব সামান্য—একটি ফ্যামিলি কার্ড, কিছু সহায়তা এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানোর একটি সুযোগ।
এ বিষয়ে সাপাহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রোমানা রিয়াজ বলেন, “লাইলী বেগমের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।”
Reporter Name 



















