সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ১১টার দিকে জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কৃষ্ণনগর এলাকা থেকে পুলিশ ও এসআরবির যৌথ অভিযানে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বলেন, শনিবার রাত ১১টার দিকে পুলিশ ও এসআরবির যৌথ অভিযানে শামীম হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানানো হবে। এর আগে এ মামলায় আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
একাধিক ঘটনায় মব সৃষ্টির অভিযোগ
স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দেবহাটার পারুলিয়া এলাকায় বিভিন্ন সময় মব সৃষ্টি করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনায় ফজলুল হক আমিনীর নাম উঠে এসেছে। তাঁদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে এলাকায় তাঁর তৎপরতা বেড়েছে। এর আগে বিভিন্ন ঘটনায় বিচারবহির্ভূত নির্যাতনে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও তাঁকে আইনের আওতায় আনা হয়নি বলে দাবি করেন তাঁরা।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাসে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে পারুলিয়ার শহিদুল ইসলাম নামের এক বীর মুক্তিযোদ্ধাকে মারধর করা হয়। একই বছরের অক্টোবরে সোহাগ হোসেন নামের আরেক যুবকের বাড়িতে লোকজন জড়ো করে গণপিটুনির ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া পারুলিয়া ইউনিয়নের এক সদস্যের বাড়িতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও মারধরের ঘটনাও ঘটে বলে স্থানীয়রা জানান। এসব ঘটনায় ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্ব বা উসকানি ছিল বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বাসিন্দা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মামলার নথি বা পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আগের বক্তব্যে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা স্বীকারের দাবি
গ্রেপ্তারের দুই দিন আগে দৈনিক পত্রদূতের পক্ষ থেকে ফজলুল হক আমিনীর সঙ্গে কথা বলা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই কথোপকথনে তিনি নিজেকে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন বলে দাবি করেন। তবে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ উঠলে তিনি নিজের অবস্থান থেকে নেতৃত্ব দেন বলে জানান।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর আগের কয়েকটি ঘটনায় উপস্থিত থাকা ও নেতৃত্ব দেওয়ার কথাও তিনি স্বীকার করেন। ফেসবুকে পোস্ট ও লাইভের মাধ্যমে লোকজন জড়ো করার বিষয়েও তিনি বক্তব্য দেন বলে দাবি করা হয়েছে। প্রশাসন তাঁকে গ্রেপ্তার করলে আপত্তি নেই এবং এ জন্য কারাবরণ বা মৃত্যুদণ্ড হলেও আফসোস থাকবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া তিনি পারুলিয়া বাজারে গরু-ছাগল জবাইয়ের কাজের পাশাপাশি মোটরসাইকেল চালক সমিতির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং বিভিন্ন মসজিদে ইমামের অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করেন বলে জানিয়েছিলেন।
শামীম হত্যা মামলায় প্রধান আসামি হিসেবে নাম আসার পর থেকে তাঁকে এলাকায় দেখা যাচ্ছিল না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা চলছিল বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মানবাধিকারকর্মীর কঠোর পদক্ষেপের দাবি
এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মী মাধব চন্দ্র দত্ত। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না। শামীম হত্যার ঘটনায় যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, মব সহিংসতা প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা জনতার নেই; অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
উল্লেখ্য, ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলা দায়েরের পর পুলিশ আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীর গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে মামলার তদন্ত ও পরবর্তী আইনি কার্যক্রমে নতুন অগ্রগতি এসেছে।
Reporter Name 


















