কাউখালী (পিরোজপুর) প্রতিনিধি
পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলা পরিষদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্য থাকায় দাপ্তরিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে, পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সেবা পেতে চরম দুর্ভোগে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। পার্শ্ববর্তী উপজেলার কর্মকর্তারা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করলেও সপ্তাহে মাত্র এক বা দুই দিন অফিসে আসায় সেবা কার্যক্রমে সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘসূত্রতা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা, ভেটেরিনারি সার্জন, সমাজসেবা কর্মকর্তা, সমবায় কর্মকর্তা, মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা, খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা, পরিসংখ্যান কর্মকর্তা, যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা এবং পোস্টমাস্টারসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে এসব দপ্তরের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
শুধু প্রশাসনিক দপ্তরই নয়, উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও নেতৃত্ব সংকটে রয়েছে। কাউখালী সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ, এস বি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং সরকারি কেজি ইউনিয়ন বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায়ও নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে। বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা মো. সাদ্দাম হোসেন সিরাজী কাউখালীসহ তিনটি উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি সপ্তাহে শুধু মঙ্গলবার কাউখালী অফিসে আসেন। ফলে উপজেলা পরিষদ ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের বিল-ভাউচার নিষ্পত্তি, সরকারি অর্থ উত্তোলনসহ গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কার্যক্রমে দীর্ঘ বিলম্ব হচ্ছে।
একইভাবে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা তামান্না খুরশিদ জাহানও তিনটি উপজেলার দায়িত্ব পালন করছেন এবং সপ্তাহে মাত্র একদিন কাউখালীতে অফিস করেন। উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা নূরে জান্নাত জিয়ান জিয়ানগর উপজেলার মূল দায়িত্বে থেকে এবং যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা উজ্জ্বল দেবনাথ নেছারাবাদ উপজেলার দায়িত্ব পালন করেও সপ্তাহে এক থেকে দুই দিন কাউখালীতে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মতিউর রহমান পিরোজপুর সদর উপজেলায় কর্মরত থেকে কাউখালীর দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। অন্যদিকে, উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মানসী ইসলাম কাউখালীর পদে থাকলেও বর্তমানে ঢাকার অধিদপ্তরে সংযুক্ত রয়েছেন। ফলে স্থানীয় সমবায় সমিতিগুলো কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সবচেয়ে নাজুক পরিস্থিতি উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসে। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে কোনো কর্মকর্তা নেই। অফিসের একমাত্র কর্মচারী মো. আসাদুজ্জামান দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তাঁকে প্রায়ই উপজেলার বাইরে দায়িত্ব পালন করতে হয়। ফলে অধিকাংশ সময় অফিসটি তালাবদ্ধ থাকে। এছাড়া পোস্টমাস্টারের পদ দীর্ঘদিন শূন্য থাকায় ডাক বিভাগের কার্যক্রমেও দেখা দিয়েছে চরম ধীরগতি।
উপজেলা সদরের বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান বলেন, “একটি জরুরি বিলের কাজ করাতে এসে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে উপজেলা অফিসে ঘুরছি। হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা সপ্তাহে মাত্র একদিন আসেন। সেদিনও এত বেশি কাজের চাপ থাকে যে সাধারণ মানুষের সিরিয়াল পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ে। কর্মকর্তা না থাকায় দিনের পর দিন ঘুরেও কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। এতে আমাদের সময় ও অর্থ—দুইই নষ্ট হচ্ছে। আমরা এই হয়রানি থেকে মুক্তি চাই।”
এ বিষয়ে কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “উপজেলার বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে স্থায়ী কর্মকর্তা না থাকায় দাপ্তরিক কাজে কিছুটা গতিহীনতা তৈরি হয়েছে, এটি সত্য। অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা নিজ নিজ উপজেলার কাজ শেষ করে এখানে সময় দেন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। পরিসংখ্যান অফিসসহ যেসব দপ্তরে জনবল সংকট রয়েছে, সে বিষয়েও আমরা অবগত আছি।”
তিনি আরও বলেন, “সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমাতে এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমকে গতিশীল করতে শূন্য পদগুলোতে দ্রুত স্থায়ী কর্মকর্তা পদায়নের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি নিয়মিত যোগাযোগও রাখা হচ্ছে। আশা করছি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর দ্রুত প্রয়োজনীয় পদায়নের ব্যবস্থা নেবে।”
Reporter Name 






















