সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
মাটি, খড় ও বাঁশের প্রচলিত কাঠামো নয়—দেড় লাখের বেশি দেশলাই কাঠি আর ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতার নিখুঁত কারুকাজে তৈরি হচ্ছে দেবী দুর্গার প্রতিমা। শারদীয় দুর্গোৎসবকে সামনে রেখে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ধুলিহর ইউনিয়নের ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা মন্দিরে এবার এমন ব্যতিক্রমী আয়োজন করা হয়েছে।
প্রতিমা তৈরির কাজ এখনো শেষ হয়নি। এরই মধ্যে ব্যতিক্রমী এই প্রতিমা দেখতে মন্দির প্রাঙ্গণে ভিড় করছেন স্থানীয়রা। কেউ বিস্ময়ে দেখছেন প্রতিমার নির্মাণকাজ, আবার কেউ মোবাইল ফোনে ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন। আয়োজকদের প্রত্যাশা, পূজার সময় সাতক্ষীরার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকেও দর্শনার্থীরা এখানে আসবেন।
মন্দির প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা যায়, চারজন প্রতিমাশিল্পী দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন। মাটির অবয়বের ওপর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে একের পর এক দেশলাই কাঠি বসানো হচ্ছে। পাশাপাশি রেশমি সুতা দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হচ্ছে নানা নকশা। সামান্য ভুলে পুরো নকশা নষ্ট হয়ে যেতে পারে বলে প্রতিটি কাঠি বসাতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছেন শিল্পীরা।
প্রতিমাশিল্পী নবদ্বীপ সরকার বলেন, “২০২৩ সালে ভারতে গিয়ে আমরা এ ধরনের কাজ দেখেছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার সাতক্ষীরায় দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চারজন শিল্পী দিন-রাত পরিশ্রম করছেন। কখনো কখনো রাত দুইটা-তিনটা পর্যন্তও কাজ করতে হচ্ছে।”
আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে দেড় লাখের বেশি দেশলাই কাঠি ও ১০ কেজির বেশি রেশমি সুতা। শুধু প্রতিমা তৈরির শ্রমিকদের পারিশ্রমিক বাবদ ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এবারের পূজা আয়োজনে প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে।
ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির সহকোষাধ্যক্ষ অমিত ঘোষ বলেন, “গত বছর আমরা ধানের প্রতিমা তৈরি করেছিলাম। তখন খরচ হয়েছিল প্রায় ৩ লাখ টাকা। এবার দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা ব্যবহারের কারণে খরচ কিছুটা বেড়েছে। সবকিছু মিলিয়ে প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয় হবে।”
ব্রহ্মরাজপুরে ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির আয়োজন অবশ্য নতুন নয়। গত বছর ১০০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল দুর্গাপ্রতিমা। সেই প্রতিমা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীদের ব্যাপক উপস্থিতি ছিল। গত বছরের সেই সাড়া থেকেই এবার আরও নতুন কিছু করার পরিকল্পনা নেয় পূজা উদযাপন কমিটি।
কমিটির উপদেষ্টা কানাইলাল শাকানু বলেন, “গত বছর ধানের প্রতিমা তৈরির পর থেকেই আমাদের চিন্তা ছিল পরের বছর আরও আকর্ষণীয় কিছু করা। সেই চিন্তা থেকেই এবার দেড় লাখের বেশি দেশলাই কাঠি দিয়ে প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাতক্ষিয়ায় এমন আয়োজন দর্শনার্থীদের মধ্যে নতুন আগ্রহ তৈরি করবে বলে আমরা মনে করি।”
দেশলাই কাঠি দাহ্য হওয়ায় প্রতিমার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে আয়োজকেরা জানিয়েছেন, বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিমায় বিশেষ কেমিক্যাল ব্যবহার করা হচ্ছে। পরীক্ষামূলকভাবে ওই কেমিক্যাল প্রয়োগ করে দাহ্যতা কমানোর বিষয়টিও পরীক্ষা করা হয়েছে।
ব্রহ্মরাজপুর সর্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, “প্রতিমাটির দাহ্যতা নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে, সেটিকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। বিশেষ কেমিক্যাল ব্যবহার করে দাহ্যতা কমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভাস্কর ও কমিটির সদস্যদের উপস্থিতিতে এর ট্রায়ালও করা
প্রতিমা তৈরির কাজ দেখতে আসা স্থানীয়দের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ দেখা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দা স্বপ্না রানী বলেন, “প্রতিবছরই এই মন্দিরে নতুন কিছু করার চেষ্টা থাকে। গত বছর ধানের প্রতিমা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করেছিল। এবার দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার প্রতিমা আরও বেশি মানুষের আগ্রহ তৈরি করবে বলে আশা করছি।”
আরেক স্থানীয় নারী বলেন, “গত বছর ১০০ কেজি চিনিগুঁড়া ধানের প্রতিমা হয়েছিল। এবার দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতার প্রতিমা হচ্ছে। ধর্ম যার যার, উৎসব সবার। আমরা চাই সবাই এখানে আসুক, প্রতিমা দেখুক এবং আনন্দ করুক।”
প্রতিমাশিল্পী নবদ্বীপ সরকার জানান, ২০২৬ সালে তিনি চারটি দুর্গাপ্রতিমা তৈরির কাজ করছেন। এর মধ্যে ব্রহ্মরাজপুরের প্রতিমাটিই সবচেয়ে ব্যতিক্রমী। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চার শিল্পী দিন
এদিকে সাতক্ষীরা জেলাজুড়েও শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে প্রস্তুতি চলছে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ জানান, ২০২৫ সালে জেলায় ৫৮৭টি পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এবারও এর কাছাকাছি বা তার চেয়ে বেশি পূজা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বনাথ ঘোষ বলেন, “২০২৫ সালে ব্রহ্মরাজপুরে ধানের প্রতিমা তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে ব্যাপক দর্শনার্থীর আগমন ঘটেছিল। এবার দেশলাই কাঠি দিয়ে প্রতিমা তৈরি হচ্ছে। যতটুকু কাজ হয়েছে, তাতে এটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন ও নান্দনিক হচ্ছে। আমরা আশা করছি, সাতক্ষীরা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে এবার দর্শনার্থীরা এখানে আসবেন।”
আয়োজকদের প্রত্যাশা, শারদীয় দুর্গোৎসবের পাঁচ দিনজুড়ে ব্রহ্মরাজপুরের এই ব্যতিক্রমী প্রতিমা দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ হয়ে উঠবে। সাধারণ দেশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে নির্মিত এই প্রতিমা শুধু পূজার আয়োজন নয়, স্থানীয় শিল্পভাবনা ও সৃজনশীলতারও অনন্য প্রকাশ হয়ে উঠছে।
Reporter Name 


















