
সাউথ বেঙ্গল নিউজ
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকায় একের পর এক ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় জনমনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কয়েকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল রাজধানীর খুব কাছাকাছি হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—এগুলো কি কেবল স্বাভাবিক ভূ-তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ার অংশ, নাকি ভবিষ্যতের কোনো বড় ভূমিকম্পের পূর্বাভাস?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাৎক্ষণিক আতঙ্কের কারণ না থাকলেও বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক থাকার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কারণ দেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং অতীতের ভূমিকম্পের ইতিহাস বড় ধরনের ঝুঁকির ইঙ্গিত বহন করে।
উৎপত্তিস্থল বারবার ঢাকার কাছেই
সর্বশেষ গত ২২ জুন রাত ৮টা ২৮ মিনিটে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এর উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে নরসিংদী-রূপগঞ্জ এলাকায়।
এর আগে চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। এছাড়া ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর ৫ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে ঢাকাসহ দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল। ওই ভূমিকম্পের কেন্দ্র ছিল নরসিংদীর মাধবদী এলাকায়, যা ঢাকা থেকে মাত্র ১৩ কিলোমিটার দূরে।
সেই ভূমিকম্পে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটে। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা ও দিনের মধ্যে নরসিংদী, বাড্ডা, পলাশ, ঘোড়াশাল ও শিবপুর এলাকায় আরও কয়েকটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যা বিশেষজ্ঞদের নজর কাড়ে।
বড় ভূমিকম্পের ইঙ্গিত কি?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া মনে করেন, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো টেকটোনিক প্লেটের স্বাভাবিক গতিশীলতার ফল হতে পারে। আবার দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা কোনো ফল্ট পুনরায় সক্রিয় হওয়ার কারণেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
অন্যদিকে, বুয়েটের ভূমিকম্প গবেষক অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারীর মতে, ঢাকার আশপাশে সম্প্রতি হওয়া ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পগুলো থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞের আশঙ্কা নেই। তবে এগুলোকে অবহেলা করারও সুযোগ নেই।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো সেই সব ফল্ট, যেগুলো অতীতে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও বগুড়ার শেরপুর অঞ্চল ভবিষ্যতের বড় ভূমিকম্পের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচিত।
ইতিহাস বলছে, ১৯১৮ সালে শ্রীমঙ্গলে ৭ দশমিক ৬ মাত্রার এবং ১৮৮৫ সালে শেরপুরে ৭ দশমিক ১ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছিল। এসব অঞ্চলের অবস্থান ঢাকা থেকে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কিলোমিটারের মধ্যে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বড় ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তির একটি নির্দিষ্ট সময়চক্র থাকে। তবে পরবর্তী বড় ভূমিকম্প কখন ঘটবে, তা নির্ভুলভাবে পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব নয়।
কেন ঝুঁকিতে বাংলাদেশ?
ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরেশিয়ান, ইন্ডিয়ান এবং বার্মিজ—এই তিনটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলের প্রভাব বলয়ের মধ্যে অবস্থিত বাংলাদেশ। ফলে দেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলজুড়ে অতীতে বহু শক্তিশালী ভূমিকম্পের রেকর্ড রয়েছে। যদিও ঢাকাকেন্দ্রিক বড় ভূমিকম্পের ইতিহাস নেই, তবুও রাজধানী বড় ধরনের কম্পনের প্রভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
ঢাকার কোন এলাকাগুলো তুলনামূলক নিরাপদ?
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে মাটির গঠন ও ভবনের কাঠামোগত মানের ওপর।
মধুপুর ট্র্যাক্টের শক্ত লাল মাটির কারণে ঢাকার উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের কিছু এলাকা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল বলে মনে করা হয়। এর মধ্যে রমনা, ধানমন্ডি, লালমাটিয়া, মিরপুর, গুলশান, তেজগাঁও, মতিঝিল, লালবাগ, নিউমার্কেট ও খিলগাঁও উল্লেখযোগ্য।
তবে অধ্যাপক মেহেদি আহমেদ আনসারীর মতে, শুধু মাটির গঠন দেখে কোনো এলাকাকে নিরাপদ বলা যায় না। ভবনের নির্মাণমান, নকশা এবং রক্ষণাবেক্ষণই ঝুঁকি নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তার মতে, পুরান ঢাকার প্রধান সমস্যা দুর্বল অবকাঠামোর চেয়ে সংকীর্ণ সড়কব্যবস্থা। বড় কোনো দুর্যোগের সময় উদ্ধার ও সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম সেখানে কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
বাড়তি উদ্বেগ ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’
বিশেষজ্ঞদের আরেকটি বড় উদ্বেগের নাম ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’ বা অদৃশ্য চ্যুতি রেখা। এসব ফল্ট ভূ-পৃষ্ঠ পর্যন্ত দৃশ্যমান নয়, ফলে সাধারণ জরিপে সহজে শনাক্ত করা যায় না।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ময়মনসিংহ ও রংপুর অঞ্চলে এমন দুটি ব্লাইন্ড ফল্ট শনাক্ত হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব ফল্ট থেকে সৃষ্ট ভূমিকম্পের আগাম পূর্বাভাস পাওয়া অত্যন্ত কঠিন।
সতর্কতার বিকল্প নেই
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলোকে বড় কোনো ভূমিকম্পের নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে বাংলাদেশের ভূ-তাত্ত্বিক অবস্থান, অতীতের শক্তিশালী ভূমিকম্পের ইতিহাস এবং বিভিন্ন সক্রিয় ও অদৃশ্য ফল্টের উপস্থিতি দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির বার্তা বহন করছে।
তাদের মতে, সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কমাতে এখনই ভবনের নির্মাণমান নিশ্চিত করা, ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করা জরুরি।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
Reporter Name 























