কক্সবাজার প্রতিনিধি:
কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার উত্তর হারবাং এলাকায় অবস্থিত হারবাং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে অব্যাহতভাবে বনভূমি দখল, গাছ নিধন, পাহাড় কাটা, সংরক্ষিত এলাকায় স্থাপনা নির্মাণ এবং বনভূমি বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর নীরব ভূমিকা ও যোগসাজশে বছরের পর বছর ধরে এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড চললেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই অভয়ারণ্যের জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
সোমবার (৩ আগস্ট) সরেজমিনে অভয়ারণ্যের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, উত্তর হারবাংয়ের নলবনিয়া এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চলের একটি বাগানের বিপুল পরিমাণ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। ঘটনাস্থলে কাটা গাছের গুঁড়ি, করাতের গুঁড়া ও কাঠের টুকরো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ একটি চক্র দিনের পাশাপাশি গভীর রাতেও গাছ কেটে বিভিন্ন স্থানে পাচার করছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, বন বিভাগের টহল দল নিয়মিত ওই এলাকায় যাতায়াত করলেও গাছ কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে উত্তর হারবাংয়ের বৃন্দাবনখীল এলাকায়। সেখানে একটি মাদ্রাসার পেছনের পাহাড় কেটে সমতল ভূমি তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে পাহাড় কাটার ফলে ভারী বর্ষণে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে এবং ধ্বংস হচ্ছে বিভিন্ন বন্য প্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল।
এছাড়া উত্তর হারবাংয়ের নাপিতের চিতা এলাকায় বেলাল নামের এক ব্যক্তির বাড়ির পাশে অভয়ারণ্যের ভেতরে নতুন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বন বিভাগের সামনেই এসব কর্মকাণ্ড চললেও কোনো কার্যকর বাধা দেওয়া হচ্ছে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, উত্তর হারবাংয়ের বরগুনা এলাকায় গাছ কাটার ঘটনায় ইসমাইল নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হলেও মোহছেন সিকদারপাড়া এলাকার রিয়াজুল হকের নাম অভিযুক্তদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মাত্র তিন হাজার টাকার বিনিময়ে তাঁর নাম প্রত্যাহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে পশ্চিম বৃন্দাবনখীল এলাকায় অভয়ারণ্যের প্রায় দুই একর বনভূমি ১৩ লাখ টাকার বিনিময়ে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, হারবাং ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য আব্দুল খালেক ওই জমি বিক্রি করেন। পরে পেকুয়ার উজানটিয়া এলাকার গিয়াস উদ্দিন জমিটি কিনে সেখানে দখল কার্যক্রম শুরু করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হারবাং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বনবিট কর্মকর্তা কবির হোসেন এসব ঘটনার বিষয়ে অবগত রয়েছেন। এমনকি তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতায় সংরক্ষিত বনভূমি ধ্বংসের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) চকরিয়া উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আলো বলেন, “হারবাং অভয়ারণ্য শুধু একটি বনাঞ্চল নয়, এটি অসংখ্য বন্য প্রাণীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল। দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে এখানকার জীববৈচিত্র্য মারাত্মক সংকটে পড়বে, যার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরো অঞ্চলের পরিবেশের ওপর পড়বে।”
অভিযোগের বিষয়ে হারবাং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বনবিট কর্মকর্তা কবির হোসেন বলেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। গাছ কাটার সঙ্গে জড়িত কয়েকজনের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বন মামলা করা হয়েছে। তদন্তে কেউ বনভূমি দখল বা পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বনভূমি বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থলে গিয়ে কিছু লোককে কাজ করতে দেখা যায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের রেঞ্জ কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান শেখের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) নুর জাহান বেগম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি এখনো অবগত নন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
Reporter Name 
















