
প্রতিনিধি, নেছারাবাদ (পিরোজপুর)
জন্মের পর থেকেই এক অদৃশ্য প্রশ্নচিহ্ন বয়ে বেড়াচ্ছেন মো. নাহিদ (২৪)। সমাজে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তিনি যেন বারবার থেমে যাচ্ছেন একটি জায়গায়—পিতৃপরিচয়। বহু দপ্তরে ঘুরেও জাতীয় পরিচয়পত্র করতে না পেরে অবশেষে নিজের অধিকার আদায়ে মুখ খুলেছেন তিনি ও তার মা।
ঘটনাটি নেছারাবাদ উপজেলার জলাবাড়ি ইউনিয়নের দক্ষিণ কামারকাঠী গ্রামের। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে একই গ্রামের মিজান বালীর সঙ্গে নাসিমা বেগমের বিয়ে হয়। কিন্তু সেই সংসার বেশিদিন টেকেনি। মাত্র এক বছরের মধ্যেই তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। তখন নাসিমা বেগম ছিলেন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা।
পরের বছর, ২০০২ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেয় নাহিদ। তবে জন্মের পর থেকেই তাকে অস্বীকার করেন অভিযুক্ত পিতা মিজান বালী। বাধ্য হয়ে মা-ছেলে আশ্রয় নেন নানাবাড়িতে। সময় গড়ালেও বদলায়নি পরিস্থিতি—আজও পিতার স্বীকৃতি ছাড়া পরিচয়হীনতার সংকটে দিন কাটছে নাহিদের।
নাহিদের অভিযোগ, “জন্ম নিবন্ধন কিংবা জাতীয় পরিচয়পত্র করতে গেলেই বাবার তথ্য লাগে। কিন্তু তিনি আমাকে স্বীকার করছেন না। সমাজেও নানা কথা শুনতে হয়। আমি শুধু আমার পিতৃপরিচয় চাই।”
একই সুরে কথা বলেন নাহিদের মা নাসিমা বেগম। দারিদ্র্য আর সংগ্রামের গল্প তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিয়ের পর অল্প সময়েই বিচ্ছেদ হয়। তখন আমি গর্ভবতী ছিলাম। সন্তান জন্মের পর তার বাবা কখনো খোঁজ নেয়নি, বরং অস্বীকার করেছে। এখন ছেলের ভবিষ্যতের জন্য এই পরিচয়টা খুব জরুরি।”
অন্যদিকে, সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত মিজান বালী। তার দাবি, “তালাকের পর নাসিমার অন্যত্র বিয়ে হয়েছিল। যে ছেলে পিতৃত্বের দাবি করছে, সে আমার সন্তান নয়। আমাকে সামাজিকভাবে হেয় করতে একটি মহল অপপ্রচার চালাচ্ছে।”
এ ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যেও রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। গ্রাম চকিদার বিপুল হালদার জানান, “তাদের বিয়ে হয়েছিল, পরে বিচ্ছেদও হয়েছে। তবে বিচ্ছেদের পর সন্তান হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টির গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। ওয়ার্ড মেম্বার লিটন খান বলেন, “ছেলেটির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলে পিতৃপরিচয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিচয় না থাকায় সে সরকারি অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।”
এ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তৌহিদুল ইসলাম তৌহিদ জানান, “নাহিদ আমাদের কাছে এসেছিল। বিষয়টি পুরনো হওয়ায় উভয় পক্ষের কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা চেষ্টা করব একটি সমাধানে পৌঁছাতে।”
একদিকে পিতার অস্বীকৃতি, অন্যদিকে সমাজের প্রশ্ন—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে নাহিদের একটাই প্রশ্ন, “আমি কি কোনোদিন আমার পিতৃপরিচয় পাবো?”
Reporter Name 



















