
প্রতিনিধি,সাতক্ষীরা ;
উপকূলীয় জনপদ সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় সূর্যমুখী চাষে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। উপজেলার ভূরুলিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এ মৌসুমে সূর্যমুখীর আবাদ করে বাম্পার ফলন পেয়েছেন কৃষকরা। এতে একদিকে যেমন তাদের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বাড়ছে, অন্যদিকে দৃষ্টিনন্দন হলুদ ফুলের সমারোহে এলাকা পরিণত হয়েছে এক নান্দনিক প্রাকৃতিক দৃশ্যে, যা টানছে দর্শনার্থীদের।

স্থানীয় কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি রবি মৌসুমে ভূরুলিয়া গ্রামে প্রায় ৪৯৫ বিঘা জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ হয়েছে। ধান কাটার পর দীর্ঘদিন পতিত পড়ে থাকা জমিকে কাজে লাগিয়ে কৃষকরা এ ফসল চাষ করছেন। তুলনামূলক স্বল্প সময়ে উৎপাদনযোগ্য এবং কম খরচে অধিক লাভজনক হওয়ায় সূর্যমুখী চাষে আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের মধ্যে। বিশেষ করে বারি হাইব্রিড-৩৬ জাতের সূর্যমুখী চাষ করে তারা ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশাও করছেন।
উপকূলীয় এ অঞ্চলের মাটিতে লবণাক্ততার মাত্রা বেশি হওয়ায় প্রচলিত অনেক ফসল চাষে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। কিন্তু সূর্যমুখী লবণাক্ততা সহনশীল হওয়ায় এটি কৃষকদের জন্য কার্যকর বিকল্প ফসল হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা জানান, সঠিক সময়ে বপন, পরিচর্যা ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনায় সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে এ অঞ্চলে সূর্যমুখী চাষে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়ালিউল ইসলামের তত্ত্বাবধানে এবং স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শে মাঠ পর্যায়ে কৃষকরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাচ্ছেন। এতে করে নতুন প্রযুক্তি ও উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারে উৎসাহিত হচ্ছেন তারা। অনেক কৃষক জানান, প্রতি বিঘা জমিতে সূর্যমুখী চাষে খরচ তুলনামূলক কম হলেও উৎপাদন ভালো হওয়ায় লাভের পরিমাণ সন্তোষজনক।
কৃষক রেজাউল ইসলাম বলেন, “আগে এই জমি ধান কাটার পর ফেলে রাখা হতো। এখন সূর্যমুখী চাষ করে ভালো ফলন পাচ্ছি। খরচ কম, লাভ বেশি—তাই আগামী বছর আরও বেশি জমিতে চাষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।” একই ধরনের অভিমত জানিয়েছেন আরও অনেক কৃষক।
দেশে ভোজ্যতেলের চাহিদা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ চাহিদা পূরণে সূর্যমুখী একটি সম্ভাবনাময় তেলবীজ ফসল হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ে তেল উৎপাদন ও সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। তারা মনে করেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, প্রশিক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা বাড়ানো গেলে সূর্যমুখী চাষ দেশের ভোজ্যতেল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
এদিকে সূর্যমুখীর ক্ষেতের মনোরম দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন বিকেলে ভিড় করছেন বিভিন্ন এলাকার দর্শনার্থীরা। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসছেন, আবার কেউ ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করছেন। ফলে কৃষিজমি এখন শুধু উৎপাদনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা পরিণত হয়েছে সম্ভাবনাময় গ্রামীণ পর্যটনকেন্দ্রে।
স্থানীয়দের মতে, পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো গেলে শ্যামনগরে কৃষিভিত্তিক পর্যটনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে। একই সঙ্গে এটি কৃষকদের আর্থসামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, প্রয়োজনীয় সহায়তা ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা উন্নত করা গেলে শ্যামনগরের সূর্যমুখী চাষ ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষিতে নতুন দিগন্ত সৃষ্টি
আহসানউল্লাহ মামুন 



















