সাতক্ষীরা প্রতিনিধি:
প্রশাসনের তৎপরতায় তাৎক্ষণিকভাবে কিছু বাল্যবিবাহ বন্ধ হলেও সাতক্ষীরায় এ প্রবণতা থামছে না। কোথাও অভিযান চালিয়ে বিয়ে বন্ধ করা হচ্ছে, নেওয়া হচ্ছে মুচলেকা; আবার কোথাও সেই অঙ্গীকার উপেক্ষা করেই অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, শুধু বিয়ের দিন অভিযান ও মুচলেকার মধ্যেই কি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ সম্ভব?
সংশ্লিষ্টদের মতে, আগাম ঝুঁকি শনাক্তকরণ, পরিবার ও সমাজের সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত নজরদারি এবং প্রশাসন-পুলিশ-বিদ্যালয়ের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া বাল্যবিবাহের লাগাম টানা কঠিন।
সম্প্রতি তালা উপজেলায় ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরীর বিয়ে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বন্ধ করা হয়। অন্যদিকে একই সময়ে শ্যামনগর উপজেলার দাতিনাখালী গ্রামে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী ও ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরের বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার ঘটনা সামনে আসে। বিষয়টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
গত সপ্তাহে তালা সদর ইউনিয়নের একটি গ্রামে বাল্যবিবাহের খবর পেয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কার্যালয় উভয় পক্ষকে নোটিশ দেয়। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণার কার্যালয়ে হাজির হলে কিশোরীর বিবাহযোগ্য বয়স পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে ও একসঙ্গে বসবাসে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। উভয় পক্ষের কাছ থেকে ভবিষ্যতে বাল্যবিবাহে জড়িত না হওয়ার মুচলেকাও নেওয়া হয়।
অন্যদিকে শ্যামনগরের ঘটনায় স্থানীয় সূত্র জানায়, দশম শ্রেণির এক ছাত্রী কিছুদিন আগে এক কিশোরের সঙ্গে পালিয়ে যায়। পরে আদালতের এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করেন ছেলের বাবা। বর্তমানে তারা একই বাড়িতে অবস্থান করছে বলেও জানা গেছে।
বাংলাদেশের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭ অনুযায়ী, অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে দেওয়া বা তাতে সহযোগিতা করার জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইন অনুযায়ী পিতা-মাতা, অভিভাবক, বর-কনে এবং বিয়ে সম্পাদনকারী কাজীও শাস্তির আওতায় আসতে পারেন।
সাতক্ষীরা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাজমুন নাহার বলেন, বাল্যবিবাহের তথ্য পাওয়ার পর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে লিখিত অঙ্গীকার নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নয়, পরবর্তী সময়েও নজরদারি জরুরি।
শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাফিউল ইসলাম পাটোয়ারী বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকলেও আনুষ্ঠানিকভাবে সহায়তা না চাইলে পুলিশের পক্ষে এককভাবে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, কেবল বিয়ের দিন অভিযান চালিয়ে তা বন্ধ করার চেয়ে আগেই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার ও কিশোর-কিশোরীদের শনাক্ত করা বেশি কার্যকর। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, স্থানীয় মধ্যস্থতাকারী ও বিয়ের আয়োজনে জড়িতদের ভূমিকা খতিয়ে দেখারও প্রয়োজন রয়েছে।
মানবকল্যাণ সংস্থার সভাপতি এস.এম. রবিউল ইসলাম বলেন, “শুধু মেয়ের পরিবারকে দায়ী করলেই হবে না। কে বিয়ের প্রস্তাব দিল, কে পরিবারকে রাজি করাল, কে আয়োজন করল এবং কারা আইনকে পাশ কাটিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করতে সহায়তা করল—সেসব বিষয়ও তদন্ত করা দরকার।”
আইনজীবীদের মতে, শুধু এফিডেভিট করলেই অপ্রাপ্তবয়স্কদের বিয়ে বৈধ হয়ে যায়—এমন ধারণা সঠিক নয়। সাতক্ষীরা জজ কোর্টের সরকারি কৌঁসুলি অ্যাডভোকেট অসীম কুমার মণ্ডল বলেন, বাংলাদেশে মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স ১৮ বছর এবং ছেলেদের ২১ বছর। এর কম বয়সে বিয়ে আইনত দণ্ডনীয়।
শিক্ষাবিদ ও সমাজকর্মীদের মতে, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পরিবারকে সচেতন করা এবং কিশোরীদের জন্য শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করা গেলে বাল্যবিবাহ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
কলেজ শিক্ষক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “একজন মেয়ের ভবিষ্যৎ শুধু বিয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা উচিত নয়। তাকে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে পারলে সে নিজেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে সক্ষম হবে।”
সামাজিক কর্মীরা বলছেন, বাল্যবিবাহ বন্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। কারণ সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে যেসব বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হচ্ছে, তার তুলনায় অনেক বেশি ঘটনা এখনো আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
তালায় প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপে একটি বিয়ে বন্ধ হলেও শ্যামনগরে অঙ্গীকারনামার পরও বিয়ে সম্পন্ন হওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে পরবর্তী নজরদারি কতটা কার্যকর? সচেতন মহলের মতে, একটি কিশোরীর ভবিষ্যৎ শুধু বিয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার শিক্ষা, দক্ষতা ও স্বপ্ন পূরণের সুযোগ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য।