প্রতিনিধি,সাতক্ষীরা;
সবুজ গাছপালার ফাঁক গলে দূর থেকেই চোখে পড়ে সারি সারি সাদা গম্বুজ আর সুউচ্চ মিনার। মনে হয়, যেন সময় থমকে দাঁড়িয়ে আছে এখানে। সেই নীরব সাক্ষী হয়ে প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে আছে সাতক্ষীরার তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ। জেলার তালা উপজেলা সদর থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার উত্তরে তেঁতুলিয়া গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন তৎকালীন জমিদার ছালামাতুল্লাহ খান। মসজিদের গায়ে খোদাই করা বাংলা ও ইংরেজি শিলালিপি থেকে জানা যায়, ১৮৫৮-৫৯ সালে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। সেই হিসাবে প্রায় ১৬৭ বছরের প্রাচীন এই স্থাপনাটি এখনো ইতিহাসের জীবন্ত নিদর্শন হয়ে টিকে আছে।
শিলালিপিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, কলকাতার মাহবানী বেগম মসজিদ (১৮৪০-৪১) এবং ধর্মতলার টিপু সুলতান মসজিদ (১৮৪২)-এর সঙ্গে তেঁতুলিয়া জামে মসজিদের স্থাপত্যশৈলীর মিল পাওয়া যায়। লেখক মিজানুর রহমান তাঁর ‘সাতক্ষীরা পুরাকীর্তি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, জমিদারি কাজের সূত্রে ছালামাতুল্লাহ খান প্রায়ই কলকাতায় যেতেন। সেখানে জাকারিয়া স্ট্রিটের একটি মসজিদের নান্দনিক স্থাপত্যে মুগ্ধ হয়ে নিজ এলাকায় একই আদলে একটি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। পরবর্তীতে দিল্লি থেকে কারিগর এনে গড়ে তোলা হয় এই অনন্য স্থাপনাটি।
মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। চার কোণায় চারটি সুউচ্চ মিনার ছাড়াও ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২০টি মিনার পুরো স্থাপনাকে দিয়েছে রাজকীয় রূপ। ছাদের ওপর দুই সারিতে রয়েছে ছয়টি বড় গম্বুজ, যার চারপাশে ছোট গম্বুজগুলো অলংকারের মতো শোভা বাড়িয়েছে।
মসজিদটিতে খিলানযুক্ত সাতটি দরজা রয়েছে, প্রতিটির উচ্চতা প্রায় আট ফুট এবং প্রস্থ সাড়ে চার ফুট। ভেতরে প্রবেশ করলে দেখা যায় দুটি বৃহৎ গোলাকার স্তম্ভ, যা গম্বুজের ভার বহন করছে। দেয়ালের টেরাকোটার কারুকাজে ফুটে উঠেছে লতাপাতা, চাঁদ ও তারার মনোরম নকশা—বিকেলের আলোয় যা আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে।
স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত আছে, মসজিদের মেঝে ও দেয়াল পালিশে সুরকি-বালুর সঙ্গে ডিমের সাদা অংশ ব্যবহার করা হয়েছিল। ফলে এত বছর পরও এর মেঝের মসৃণতা দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে।
খুলনা-পাইকগাছা সড়কের পাশে অবস্থিত মসজিদটি দুটি অংশে বিভক্ত। পশ্চিমাংশে রয়েছে ছাদযুক্ত মূল নামাজঘর (দৈর্ঘ্য ৪৭ ফুট, প্রস্থ ৩০ ফুট) এবং পূর্বাংশে ছাদবিহীন চত্বর (দৈর্ঘ্য ৩৭ ফুট, প্রস্থ ৩০ ফুট), যেখানে বর্তমানে টিনের ছাউনি দেওয়া হয়েছে। মসজিদের ভেতরে প্রায় ১৫০ জন এবং বাইরে আরও ২০০ জন মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।
মসজিদের খতিব মো. আবদুর রব জানান, ১৯৮৭ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উদ্যোগে মসজিদের মেঝে সংস্কার করা হলেও বর্তমানে সেই অবস্থা আর নেই। স্থানীয়ভাবে রক্ষণাবেক্ষণ কঠিন হয়ে পড়েছে, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা কাজী মহিবুল ইসলাম বলেন, দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এই ঐতিহাসিক মসজিদ দেখতে আসেন। তবে টেরাকোটার মূল নান্দনিক সৌন্দর্যের অনেকটাই এখন রঙের প্রলেপে ঢাকা পড়েছে।
মসজিদ কমিটির আহ্বায়ক কাজী শামীমুল ইসলাম জানান, একসময় প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সংস্কার কাজ করলেও বর্তমানে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। দ্রুত সরকারি উদ্যোগে যথাযথ সংরক্ষণ না হলে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।