রমজান এলেই যেন আমাদের ছোট্ট পৃথিবীটা একেবারে বদলে যেত। স্কুল বন্ধ থাকলেও পুরো স্বাধীনতা ছিল না—সকালে আব্বার কড়া শাসন আর মায়ের মমতাময়ী নজরে নিয়ম মেনে পড়াশোনা চলত। তবুও মনটা পড়ে থাকত বাইরে—কখন বের হব, কখন বন্ধুদের সঙ্গে খেলায় মেতে উঠব, সেই অপেক্ষাতেই কাটত দিন।
আমাদের কাছে ঈদ মানেই ছিল মার্বেলের রঙিন দুনিয়া। ছোট ছোট কাঁচের গোলকগুলো যেন ছিল আমাদের আনন্দের ভাণ্ডার। দাগ কেটে ‘গড়গড়া’ খেলায় সকাল থেকে দুপুর কেটে যেত চোখের পলকে। জিতলে উচ্ছ্বাস, হারলেও তেমন কোনো কষ্ট নয়—কারণ পাশে ছিল প্রিয় বন্ধুদের সঙ্গ।
চাঁদ রাতের আগেই আমরা মার্বেলগুলো মাটির নিচে লুকিয়ে রাখতাম—যেন ঈদের দিনের জন্য জমিয়ে রাখা ছোট্ট সুখ। আর নতুন জামা! আব্বা যখন কিনে দিতেন, সেটি শুধু একটি পোশাক ছিল না—ছিল স্বপ্ন, ছিল আনন্দের প্রতীক। বারবার বের করে দেখতাম, ছুঁয়ে দেখতাম, আর মনে মনে চাইতাম—সময়টা যেন দ্রুত কেটে যায়, ঈদটা যেন তাড়াতাড়ি আসে।
ঈদের সকাল শুরু হতো ভোরের নরম আলো আর মায়ের হাতে তৈরি সেমাইয়ের মিষ্টি ঘ্রাণে। আব্বা নামাজ পড়ে বাজারে যেতেন, আর আমরা সুযোগ বুঝে ছুটে যেতাম খেলায়। সেমাইয়ের ডাক এলেই একটু থামতাম, কিন্তু মন পড়ে থাকত মাঠেই। তারপর গোসল, নতুন জামা, গায়ে সুগন্ধি—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম প্রস্তুতি। ঈদের নামাজ শেষে আব্বা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সালামি, আর বন্ধুদের সঙ্গে আবার খেলায় ডুবে যাওয়া—এটাই ছিল আমাদের ঈদের আসল আনন্দ।
পাড়ার এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি ঘুরে ঘুরে খাওয়া, গল্প, হাসি—সব মিলিয়ে দিনটা হয়ে উঠত আনন্দে ভরা। কখন যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামত, তা টেরই পাওয়া যেত না।আজ সময় অনেক বদলে গেছে। আব্বা-মা আর নেই, আমরা নিজেরাই এখন দায়িত্বের ভার কাঁধে তুলে নিয়েছি। তবুও হৃদয়ের গভীরে সেই শৈশবের ঈদ আজও জীবন্ত—নির্ভেজাল আনন্দ, ছোট ছোট সুখ আর অফুরন্ত ভালোবাসার এক অমলিন স্মৃতি হয়ে।
শৈশবের সেই ঈদ আর কখনো ফিরে আসবে না—তবে সেটি কখনোই ভোলা যাবে না।