
কাউখালী (পিরোজপুর) প্রতিনিধি:
দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ চারা উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলা। বছরের নির্দিষ্ট মৌসুমে উপজেলার শতাধিক নার্সারি ও ঐতিহ্যবাহী কাউখালী হাটকে ঘিরে গড়ে ওঠে কোটি টাকার চারা বাণিজ্য। উন্নত মানের বনজ ও ফলজ চারার জন্য দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকার ও খুচরা ক্রেতারা ছুটে আসেন এখানে।
প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক মাস পর্যন্ত চারা বিক্রির মৌসুম থাকলেও আষাঢ় থেকে আশ্বিন—এই চার মাসে বেচাকেনা থাকে সবচেয়ে জমজমাট। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার ও সোমবার কাউখালী হাটে বসে দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম বড় চারা বাজার। এছাড়া বিভিন্ন জেলার পাইকাররা সরাসরি স্থানীয় নার্সারিতে গিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী চারা সংগ্রহ করেন।
উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে নৌকা, ট্রলার, লঞ্চ ও ট্রাকযোগে সহজেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে চারা সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে কাউখালীর চারা এখন দক্ষিণাঞ্চল ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
স্থানীয় নার্সারিগুলোতে রেইনট্রি, মেহগনি, চাম্বল, গামার, সেগুন, আকাশমণিসহ ৩০ থেকে ৪০ প্রজাতির বনজ চারা এবং আমড়া, আমলকী, জলপাই, নারকেল, সুপারি, আম, জাম, কাঁঠাল, পেয়ারা ও লিচুসহ ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির ফলজ চারা উৎপাদন করা হয়। উন্নত মান, অধিক টিকে থাকার সক্ষমতা এবং সাশ্রয়ী দামের কারণে এসব চারার ব্যাপক চাহিদা রয়েছে মাদারীপুর, বাগেরহাট, খুলনা, বরিশাল, ঝালকাঠিসহ দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায়।
ঝালকাঠি থেকে চারা কিনতে আসা ব্যবসায়ী তানভীর আহমেদ বলেন, “প্রতি মৌসুমেই কাউখালী থেকে কয়েক হাজার টাকার চারা কিনি। এখানকার চারার মান ভালো হওয়ায় আমাদের এলাকায় এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।”
স্থানীয় নার্সারি ব্যবসায়ী মো. হানিফ জানান, তিনি দুই বিঘা জমিতে বিভিন্ন প্রজাতির চারা উৎপাদন করেন। প্রতি মৌসুমে এ ব্যবসা থেকে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় হয়, যা তার পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সোমা রানী দাস বলেন, “কাউখালীর চারা উৎপাদন ও বিপণন এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষক ও নার্সারি মালিকরা যাতে উন্নত জাতের মানসম্মত চারা উৎপাদন করতে পারেন, সে জন্য কৃষি বিভাগ নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে। মাটির টালির স্বল্পতাসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রণোদনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, “কাউখালীর নার্সারি শিল্প এখন শুধু স্থানীয় চাহিদা পূরণ করছে না, জাতীয় পর্যায়েও চারা সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে কাউখালী দেশের অন্যতম বৃহত্তম চারা উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নার্সারি উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।”
স্থানীয়দের মতে, চারা উৎপাদন ও বিপণনকে কেন্দ্র করে কাউখালীতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। পরিকল্পিত সম্প্রসারণ, সরকারি সহায়তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এ শিল্প আরও বিকশিত হলে জাতীয় অর্থনীতিতে কাউখালীর অবদান আরও উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠবে।