কামাল উদ্দিন, কক্সবাজার প্রতিনিধি
মানুষ-হাতি সংঘাত কমিয়ে বন্যহাতি সংরক্ষণে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার হারবাং ও আজিজনগর এলাকায় পৃথক দুটি উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বন্যহাতির আবাসস্থল ও চলাচলের পথ সংরক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি সংঘাত এড়াতে স্থানীয়দের করণীয় বিষয়ে সচেতন করা হয়।
বুধবার (১৮ জুন) বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ, চট্টগ্রামের উদ্যোগে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের আওতাধীন হারবাং ও আজিজনগর বনবিট কার্যালয়ে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। এতে বন বিভাগের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, স্বেচ্ছাসেবক এবং বনাঞ্চলসংলগ্ন এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন।
চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের রেঞ্জ কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান শেখের নির্দেশনায় আয়োজিত বৈঠকে বক্তব্য দেন আজিজনগর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য বিট কর্মকর্তা মো. রেজাউল হক, হারবাং বনবিট কর্মকর্তা কবির হোসেনসহ বন বিভাগের অন্যান্য কর্মকর্তারা।
বক্তারা বলেন, বন্যহাতি দেশের জীববৈচিত্র্য ও বনজ বাস্তুতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তবে বন উজাড়, পাহাড় কাটা, অবৈধ দখল এবং মানববসতির বিস্তারের কারণে হাতির আবাসস্থল ও বিচরণক্ষেত্র ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। ফলে খাদ্য ও নিরাপদ চলাচলের সংকটে পড়ে হাতির পাল প্রায়ই লোকালয়ে প্রবেশ করছে। এতে একদিকে মানুষের জানমাল ও কৃষি ফসলের ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডের শিকার হয়ে হাতিও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
তারা আরও বলেন, মানুষ ও হাতির শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হলে হাতির প্রাকৃতিক করিডর সংরক্ষণ এবং বনাঞ্চল রক্ষায় স্থানীয় জনগণের সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাতির অবস্থান শনাক্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখা, দলবদ্ধভাবে চলাচল করা এবং দ্রুত বন বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বৈঠকে স্থানীয় বাসিন্দারা হাতির আক্রমণে ফসল, ফলজ বাগান ও বসতবাড়ির ক্ষয়ক্ষতির বিভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তারা ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং কার্যকর প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান। পাশাপাশি হাতির উপদ্রবপ্রবণ এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধি ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদারের আহ্বান জানান।
জবাবে বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, মানুষ-হাতি সংঘাত নিরসনে সরকার ও বন বিভাগ নানা উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। তবে স্থানীয় জনগণের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া এসব উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও সংঘাত কমাতে সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
এ সময় অংশগ্রহণকারীদের হাতির আচরণ, চলাচলের ধরণ, ঝুঁকিপূর্ণ সময় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত ধারণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে হাতি হত্যা, আহত করা কিংবা তাদের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা সৃষ্টি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, বন্যহাতি শুধু একটি প্রাণী নয়; এটি দেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্য ও জীববৈচিত্র্যের অমূল্য সম্পদ। পরিবেশ ও বন রক্ষার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সবাইকে সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি বন্যহাতির টিকে থাকার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে টেকসই সহাবস্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।